সরকার আরো কিছু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কবে নাগাদ এমপিওভুক্ত করা হবে সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শিক্ষাসচিব সোহরাব হোসাইন সরকারি এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন, নীতিমালা হালনাগাদ করা, প্রতিষ্ঠান যাচাই-বাছাই করা, প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন হলে এমপিওভুক্তি কার্যকর করা হবে। আগামী জুন নাগাদ এমপিওভুক্তি হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।
হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত : মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের নতুন করা প্রস্তাবে সারাদেশের এমপিওবিহীন ৭ হাজার ১৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে বার্ষিক ২ হাজার ১৮৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ২৫০ টাকা লাগবে বলে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ১২২৭টি নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ২১৯ কোটি ৭১ হাজার ৩০০ টাকা; ১ হাজার ৮৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৩৬৮ কোটি ১৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৫০ টাকা; এমপিওভুক্ত ৩ হাজার ২৭৫টি নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মাধ্যমিকে উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করতে ৫২২ কোটি ৬০ লাখ ৮১ হাজার ২৫০ টাকা; ৫১৮টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের জন্য ৩৫৭ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং এমপিওভুক্ত ১ হাজার ৩৩টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজকে ডিগ্রি স্তরে উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করতে ৭১৭ কোটি ৩৮ লাখ ২৩ হাজার ৪৫০ টাকা লাগবে।
এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতিটি ডিগ্রি কলেজ এমপিওভুক্ত করতে বছরে লাগে ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫০ টাকা; উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের লাগে ৬৮ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা, আর নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাগে ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭৫০ টাকা।
পর্যায়ক্রমে হবে :মাউশির বাজেট শাখা থেকে জানা গেছে, এই মুহূর্তে সারাদেশে এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণ করে অপেক্ষমাণ ৫ হাজার ২৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এগুলোতে কর্মরত এমপিওভুক্তির যোগ্য শিক্ষক-কর্মচারী আছেন প্রায় ৭৫ হাজার। তাদের সবাইকে এক অর্থবছরের বাজেটে এমপিওভুক্ত করা কঠিন। এ জন্য পর্যায়ক্রমে যোগ্য সবাইকে এমপিওভুক্ত করা হবে। এই মুহূর্তে থোক বরাদ্দ পেলে দুই থেকে আড়াই হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারে। ছয় মাস পর ২০১৮-২০১৯ সালের বাজেটে আরও আড়াই হাজার নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া প্রস্তাবিত নীতিমালায় জনসংখ্যা অনুপাতে সংশ্নিষ্ট এলাকায় এমপিওর প্রাপ্যতা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে প্রতিষ্ঠানের ভালো ফল, প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ আরও কিছু শর্ত। এমপিওভুক্ত হতে চাইলে সংশ্নিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমি থাকতে হবে। ভাড়া ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো প্রতিষ্ঠান যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। জানা গেছে, ‘নীতিমালা অনুসারে প্রাপ্য না হলেও দেশের পিছিয়ে পড়া এলাকা, চা-বাগান, হাওর, পার্বত্য এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। প্রত্যেক উপজেলায় কমপক্ষে একটি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত রাখার আশা আছে।
সূত্র জানায়, গতকাল মঙ্গলবার সকালে অর্থমন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠকে নতুন এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারপর অনশন কর্মসূচিতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এসে শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আশ্বাস দেন। এ সময় শিক্ষাসচিব উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষকরা শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অগ্রাহ্য করছেন। তারা চাইছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ঘোষণা আসুক।
তবে স্বাধীনতা শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শাহাজাহান আলম সাজুর নেতৃত্বে ননএমপিও শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সাথে সচিবালয়ে বৈঠক করেছেন। তারা শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রেখে যতদ্রুত সম্ভব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।
আন্দোলন কর্মসূচির ৮ম দিন ও অনশন কর্মসূচির তৃতীয় দিনে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অনশনস্থলে এসে শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়ে আমরণ অনশন প্রত্যাহার করতে অনুরোধ জানান।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। অর্থমন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয় বসে আমরা আপনাদের এমপিওভুক্ত করবো। তখন এমপিওভুক্তির নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার দাবি জানান শিক্ষকরা। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দেশের বাইরে আছেন। তবে যাওয়ার আগে তিনি অর্থমন্ত্রণালয় থেকে এমপিওভুক্তির বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করছি।
শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য, ‘আমি এই পরিবারের একজন কর্মী। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। আশা করি, আপনারা বিষয়টা বুঝবেন। আপনাদের এমপিওভুক্ত করা হবে।’
শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যে আস্থা না রাখতে পারায় শিক্ষকরা এ সময় ‘শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা মানি না মানবা না’ স্লোগান দিতে থাকেন। স্লোগানের মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রী অনশনস্থল ত্যাগ করেন।
শিক্ষামন্ত্রী মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মোঃ আলমগীর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক এসএম ওয়াহিদুজ্জামানসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে অনশন স্থলে উপস্থিত হন।
এর পরে ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় ভূষণ রায় বক্তব্য দেন। শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ছাড়া তারা কোনো কিছুই মানবেন না। প্রধানমন্ত্রীর বার্তা না নিয়ে তারা বাড়ি ফিরবেন না। তাই অনশন চলবে।
বেলা ১২টায় অনশনরত সংগঠনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি ৭০২নং ওয়ার্ডের ৫০নং বেডে চিকিত্সাধীন আছেন।
শিক্ষক নেতৃবৃন্দ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণার দাবি করে এ ব্যাপারে প্রধামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তারা এমপিওভুক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন না বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আমরণ অনশনের ৩য় দিনে ৩৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৭০২নং ওয়ার্ডের ৫১নং বেডে খুলনার সুপার বাহরুল ইসলাম, ৪০নং বেডে নওগাঁর চকরঘুনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের মোঃ বাবুল হোসেন মন্ডল, বগুড়ার ধুপকাঠীর শিক্ষক সেকেন্দার আলী, মাগুরা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের ইকরামুল ইসলাম, কুষ্টিয়ার সিরাজউদ্দৌলা কলেজের আশরাফুল আলম লাভলু প্রমুখ।
৩য় দিনে আমরণ অনশনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন সাবেক শিক্ষক নেতা কাজী ফারুক আহমেদ, বিটিএ’র সভাপতি সৈয়দ মোফাজ্জেল, ইব্রাহীম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক আবু সাঈদ (কমিউনিটি মেডিসিন), বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা অনুপম বড়ুয়া, জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মোঃ মহসিন রেজা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক হাফেজ মোঃ হেমায়েত উদ্দীন, বাংলাদেশ ভোকেশনাল শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আলমগীর হোসেন প্রমুখ।

Post a Comment